
পবিত্র রমজান ও ঈদ মুসলমানদের জন্য আত্মশুদ্ধি, সংযম ও আনন্দের মাস। কিন্তু চট্টগ্রামের কিছু এলাকায় এই ধর্মীয় উৎসবকে ঘিরেই তৈরি হয়েছে এক অমানবিক সামাজিক চাপ। তথাকথিত কিছু লোভী ব্যক্তি ও পরিবার বছরের পর বছর ধরে রমজান-ঈদকে কেন্দ্র করে মেয়ের বাবার কাছ থেকে নানা উপকরণ ও অর্থ আদায়কে ‘সম্মান রক্ষার নিয়ম’ হিসেবে চালিয়ে দিচ্ছেন—যা বাস্তবে এক ধরনের সামাজিক নির্যাতন। কিছু লোকের চাপিয়ে দেওয়া অমানবিক ও অইসলামিক প্রথায় আজ অসহায় হয়ে পড়ছেন অসংখ্য মেয়ের বাবা। একই সাথে যৌতুকের নামে নিঃস্ব হচ্ছে বহু পরিবার; এমনকি হতাশা ও অপমান সইতে না পেরে কেউ কেউ আত্মহত্যার পথও বেছে নিচ্ছেন।
চট্টগ্রামে প্রাচীন আমল থেকে চলে আসা সামাজিক অপসংস্কৃতির মধ্যে রমজানে ইফতার, ঈদে সেমাই-চিনি, শবে বরাত, কুরবানি কিংবা বিভিন্ন সামাজিক উপলক্ষকে সামনে রেখে মেয়ের বাবার কাছ থেকে নিয়মিতভাবে অর্থ, খাবার ও উপকরণ আদায়ের ঘটনাকে এখন অনেকেই ‘সম্মান রক্ষার নিয়ম’ বলে চালিয়ে দিচ্ছেন—যা বাস্তবে এক ধরনের সামাজিক নির্যাতন।
তবে বর্তমান কিছু তরুণ এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছেন। আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়–এর শিক্ষার্থী হাফেজ মাওলানা মোহাম্মদ রেজাউর রহমান ও সাংবাদিক মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিনসহ বেশ কিছু তরুণ যৌতুকবিহীন “মুহরে ফাতেমা”, অর্থাৎ সুন্নত পদ্ধতিতে বিবাহ সম্পন্ন করে তরুণ ও যুব সমাজকে অপসংস্কৃতি পরিহারের বার্তা দিয়ে যাচ্ছেন।
বিকৃত মানসিকতার চিত্র
স্থানীয়ভাবে প্রচলিত এই বিকৃত মানসিকতায় বলা হয়—
বিশেষ করে বড় লোক বা উচ্চ বংশের লোকের “ছেলের শ্বশুরবাড়ি থেকে কুরবানির গরু না দিলে বাবার সমাজে সম্মান থাকবে না।” এমন কথাও জনমুখে শোনা যায়।
প্রশ্ন উঠছে—আদায় করে নেওয়া জিনিস কি কখনো সম্মান হতে পারে? সচেতন মহলের মতে, এটা সম্মান নয়; বরং চাপ সৃষ্টি করে আদায় করা ভিক্ষা।
সম্মানের নামে যা চলছে
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কিছু এলাকায় ছেলের বাবার সমাজে বছরের বিভিন্ন সময়ে ১০০ বা তারও বেশি পরিবারের নাম ব্যবহার করে মেয়ের বাবার কাছ থেকে বছরের পর বছর নানা উপকরণ আদায় করা হয়।
এর মধ্যে রয়েছে—
বিয়ের প্রথম বছরে বিশেষ আয়োজন
শবে বরাতের নামে মাংস, রুটি ও হালুয়া, রমজানে ইফতারি, ঈদে পরিবারের সবার জন্য কেনাকাটা (বিয়ের প্রথম বছরে উভয় পরিবারে), কুরবানির সময় ছাগল বা গরু, মুহররমে ভাত-তরকারি, মৌসুমি ফল: আম, কাঁঠাল, তরমুজ, আনারস
তালপিঠা, মধুভাতসহ বিভিন্ন উপকরণ। কোনো কোনো পরিবারে সন্তান জন্ম হলে সমাজ বা স্বজনদের জন্য অধিক পরিমাণে মিষ্টি, তেল, সাবান, আত্মীয়দের জন্য শাড়ি উপহার এবং ১০০–২০০ জনের জন্য খাবারের আয়োজনের চাপ দেওয়া হয়।
কোনো এলাকায় মেয়ের পরিবার এসব দিতে অপারগ হলে মেয়েকে কটূক্তি, অপমান ও সামাজিক চাপের মুখে পড়তে হয়। বিশেষ করে পরিবারের সাথে লাগোয়া স্বজনদের কাছ থেকেই বেশি অপমানজনক কথা শোনা যায়। অনেক ক্ষেত্রে ধারদেনা করে সর্বস্ব হারিয়ে অসহায় অবস্থায় জীবন কাটাতে হচ্ছে বলে খবর পাওয়া যায়।
বাস্তবতা কী?
সচেতন নাগরিকদের মতে—
সম্মান দেওয়া হয়, আদায় করা যায় না
মেয়ের বাবা কোনো দাতা নন; তিনি একজন অভিভাবক
যৌতুক যেমন অপরাধ, তেমনি এই ‘বাৎসরিক যৌতুক সংস্করণও’ অপরাধ
ধর্মীয় উপলক্ষকে ব্যবহার করে চাপ সৃষ্টি করা ধর্মের চরম অবমাননা আর সমাজ পরিচালনার নামে লজ্জাজনক মানসিকতা। যারা এসব অন্যায় প্রথাকে ‘সমাজের নিয়ম’ বানিয়ে নিয়েছে, তারা প্রকৃত অর্থে সমাজের প্রতিনিধি নয়—বরং সমাজের লজ্জা। ধর্মকে ঢাল বানিয়ে ভিক্ষাকে বৈধ করা এবং সম্মানের দোহাই দিয়ে মানুষের পকেটে হাত দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
আমাদের করণীয়
বিশ্লেষকদের মতে, এখনই প্রয়োজন—
এসব অন্যায় প্রথার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিবাদ
পরিবার ও অভিভাবকদের সচেতন করা
নৈতিক, শিক্ষিত ও সাহসী নেতৃত্ব গড়ে তোলা
ধর্ম ও সম্মানকে সব ধরনের ব্যবসা ও লেনদেন থেকে মুক্ত করা
সম্মান ভিক্ষায় পাওয়া যায় না।
সম্মানের নামে ভিক্ষা করাই সবচেয়ে বড় অসম্মান।
লেখক ও সাংবাদিক
এইচ এম এরশাদ
বিএ (অনার্স), এমএ (ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি)